Search

শিশুর ভালো স্বাস্থ্য:

আমাদের সবার কাম্য শিশু শারীরিকভাবে ভালো থাকবে কিন্তু আমরা জেনে না জেনে অনেক ছোট ছোট ভুল করি যা শিশুর শারীরিক বিকাশে ও বৃদ্ধিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে থাকে।

আলোচনা করবো সংক্রমণ রোধ অর্থাৎ কোনো প্রকার রোগ সংক্রমণ হতে অন্যদের কিভাবে নিরাপদে রাখা যায়। একটি শিশু থেকে অন্য আরেকটি শিশুকে কিভাবে কোনো রোগ সংক্রমণ থেকে রক্ষা করা যাবে তাই আমরা এখানে মূলত আলোচনা করবো। স্বাভাবিকভাবে দেখা যায় ৩-৫ বছরের নিচের বাচ্চাদের পেট ব্যথা, ঠান্ডা ,কাশি থেকে অন্যান্য শিশুরা দ্রুত সংক্রমিত হয়। শিশুরা সবসময় কোলাহলমুখর পরিবেশে মিশতে পছন্দ করে ফলে সংক্রমণের হার তাদের ক্ষেত্রে বেশি থাকে। এইজন্য শিশুদেরকে কিছু প্রয়োজনীয় শিক্ষা ছোটবেলা থেকেই প্রদান করতে হবে।

যেমন ,

১. হাত ধোয়ার অভ্যাস করানো। শিশুদের ছোটবেলা থেকে হাত ধোয়ানোর শিক্ষা দিতে হবে বিশেষ করে বাথরুমের পর এবং খাবার খাবার পূর্বে তাদের বাধ্যতামূলক এই অভ্যাসগুলো করাতে হবে।

২. ঠান্ডা, কাশি থাকলে নাক পরিষ্কার করার পরে হাত ধোয়ানো শেখাতে হবে। ধুলাবালি বা নোংরা লাগলে যাতে তারা নিজের থেকেই হাত পরিষ্কার করতে পারে এই প্রাথমিক শিক্ষাগুলো তাদের ছোটবেলা থেকেই দিতে হবে। দেড় বছরের নিচের বাচ্চারা নিজেদের কাজ করতে পারে না সেক্ষেত্রে এডাল্টদের পাতলা কাপড় বা রুমাল দিয়ে হাতটি তাদের পরিষ্কার করে দিতে হবে। দেড় বছরের উপরের বাচ্চারা সহজেই নিজেদের কাজ করতে পারে তাই ছোটবেলা থেকেই তাদের এই শিক্ষাগুলো প্রদান করতে হবে।

৩. তাছাড়া বাচ্চাদের সময়মতো টিকাদান করানো বাবা মাদের অন্যতম দায়িত্ব। তাহলে শিশুরা সহজে কোনো রোগে আক্রান্ত হবে না, এমনকি রোগ প্রতিরোধেও টিকা বিশেষ ভূমিকা রাখবে। তাই বাচ্চাদের সময়মতো টিকাদান করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ক্লাসে যদি একটি বাচ্চা বমি, কাশি কিংবা সিসোনাল ফুলু নিয়ে আসে ২/৩ দিনের মাথায় সেই ফুলু খুব দ্রুত বাকি বাচ্চাদের মাঝে ছড়িয়ে পরে এই জন্য বাচ্চাদের প্রাথমিক শিক্ষা ও সময়মতো টিকাদান উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ।

সুতরাং শিশুকে প্রতিনিয়ত প্র্যাক্টিস করানোর মাধ্যমে এই বিষয় সমূহ শেখাতে হবে। এই প্র্যাক্টিস শিশুকে তিনভাবে করানো সম্ভব।

১. ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি (Personal Hygiene) : নিজের প্রতি সচেতনতা ও সবসময় পরিষ্কার পরিছন্ন থাকা।

২. পরিবেশগত স্বাস্থ্যবিধি (Environmental Hygiene ) : পরিবেশের কোনো উপাদানের ক্ষয়সাধন যাতে না হয় তার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা ও যতটুকু সম্ভব পরিষ্কার রাখা।

৩. বর্জ্য পদার্থ নিষ্পত্তি (Disposing of Waste Material) : বর্জ্য পদার্থ নিষ্কাশন পরিবেশ সুন্দর রাখার জন্য খুবই জরুরি সেই দিকেও প্রতিষ্ঠানের/পরিবারের কর্মীদের নজর রাখতে হবে। এইজন্য ময়লা অবর্জনা সঠিকস্থানে ফেলতে হবে।

এক্ষেত্রে একজন Practitioner (স্টাফ) বা এডাল্টদের দায়িত্ব হচ্ছে পরিবেশ ও বর্জ্য পদার্থ নিষ্পত্তির স্বাস্থ্যবিধি মেনে এসব পরিষ্কার পরিছন্ন রাখা এবং অবশ্যই কাজ শেষে ও খাবার শুরুতে সর্বনিম্ন ২০ সেকেন্ড ভালো করে নিজেদের হাত ধুয়ে ফেলা। শুধু নিজেদের জন্য না, কোনো বাচ্চাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে হলে,কিংবা খাওয়াতে হলেও তাদের হাত ধুয়ে নেয়ার ব্যাপারটা মাথায় রাখতে হবে। এইজন্য ভালো মানের সাবান ব্যবহার করতে হবে ও পরিষ্কার তোয়ালে দিয়ে হাত ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। স্টাফদের হাতের নখ সবসময় কাঁটা থাকতে হবে এবং ভালোমতো পরিষ্কার করতে হবে। কেননা হাতের নখের মাঝে জমে থাকা ময়লা ও নখের উপর নেইলপলিশে জন্ম নেওয়া ব্যাক্টেরিয়া থেকে অসুখ বিসুখ হতে পারে। কেউ যদি নখ রাখতে চায় তাকে ডিসইনফেক্টেড নেইলব্রাশ ব্যবহার করতে হবে।

ডে-কেয়ার সেন্টার কিংবা প্রি-স্কুলের স্টাফদের প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত ইউনিফর্ম ব্যবহার এবং সবসময় চুল পরিপাটি করে বেঁধে রাখা। নয়তো বাচ্চাদের খাবারের মধ্যে চুল এসে পরার সম্ভাবনা থাকবে।

ভাল স্বাস্থ্যবিধি অনুশীলন

ভালো স্বাস্থ্যবিধির জন্য মাথায় রাখতে হবে শিশুটি যে পরিবেশে বেড়ে উঠবে সেই পরিবেশ তার জন্য কতটুকু

স্বাস্থসম্মত। এক্ষেত্রে যা করণীয় :

১. শিশুরা যে রুমে থাকবে সে রুমে জানালা আছে কিনা নয়তো পর্যাপ্ত আলো বাতাসের অভাব হতে পারে।

২ .শিশুদের দেখাশুনা করার জন্য পর্যাপ্ত কর্মী নিয়োগ করা আছে কিনা এই বিষয়টাও দেখতে হবে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কর্মী থাকলে সেটা শিশুদের জন্য ক্ষতিকর।

৩. এক বছরের নিচের বাচ্চাদের জন্য আলাদা পরিষ্কার রুমের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

৪. শিশুদের দেখাশোনার করার সময় তাদের খাওয়ানো কিংবা বমি করে দিলে ওগুলো পরিষ্কার করার জন্য আলাদা এপ্রোন ব্যবহার করতে হবে। এক বছরের নিচের বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো আরো খেয়াল রাখতে হবে। তাদের ন্যাপি বদলানোর সময়, খাওয়ানোর সময় সবসময় পরিষ্কার কাপড় পরা থাকতে হবে। শিশুর খেলার উপকরণ প্রতিদিন পরিষ্কার করতে হবে।

৫. শিশুদের রুম পরিষ্কারের ক্ষেত্রে মাথায় রাখতে হবে খাবার রুম পরিষ্কারের কাপড়/ মপ ও খেলার রুম পরিষ্কারের কাপড়/মপ আলাদা থাকতে হবে. একই কাপড়/মপ দিয়ে দুইটা কাজ কখনো করা যাবে না। নয়তো খেলার রুমের ব্যাকটেরিয়া খাবাবের মধ্যে চলে আসতে পারে।

৬. শিশু যে টয়লেট ব্যবহার করবে সেই টয়লেটও প্রতিদিন জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। টয়লেটের ফ্লোর সবসয় শুকনা রাখতে হবে নয়তো বাচ্চারা পরে গিয়ে ব্যথা পেতে পারে।

৭. প্রতিটা রুমে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন থাকতে হবে। এবং ডাস্টবিনগুলো যাতে পা ব্যবহার করে খোলা বা বন্ধ করা যায় এমন ডাস্টবিন কিনতে হবে। ডাস্টবিন প্রতিদিন পরিষ্কার করতে হবে যাতে সেখান থেকে গন্ধ না ছড়ায়।

৮. শিশুদের ব্যবহৃত কাপড়, খাবারের সময় ব্যবহৃত রুমাল প্রতিদিন পরিষ্কার করতে হবে। অবশ্যই গরম পানি ব্যবহার করতে হবে।

৯. ইউ কের আইন অনুযায়ী , ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড হেলথ আনুযায়ী আন্ডার এইট ইয়ার্স ডে-কেয়ার এন্ড চাইল্ড ম্যান্ডিং রেগুলেটের বোর্ড নির্ধারিত করে দিয়েছে , শিশুর বয়স দুই বছরের নিচে থাকলে একজন পূর্ণ বয়স্ক ব্যক্তি তিনটি শিশুর যত্ন নিতে পারবে (১:৩), শিশুর বয়স দুই বছর এর উর্দ্ধে হলে একজন পূর্ণ বয়ষ্ক ব্যক্তি চারটি (১:৪) শিশুর যত্ন নিতে পারবে, আর (৩-৮ বছর) হলে একজন পূর্ণ বয়স্ক ব্যক্তি ৮জন শিশুর যত্ন নিতে পারবে। সুতরাং এই অনুপাত অনুযায়ী কর্মী নিয়োগ করতে হবে। এর বিরূপ ঘটলে ইন্সপেকশনে আসলে কর্মী সংখ্যা কম থাকলে তাদের বাধ্যতামূলক ফাইন দিতে হবে। এমনকি প্রতিষ্ঠান বন্ধ পর্যন্ত করে দিতে পারে।

১০. শিশুদেরকে শেখাতে হবে ঘরের ভিতরে থাকা অবস্থায় প্রতিষ্ঠানের বা পরিবারের কোনো জিনিস নষ্ট না করা, অন্যান্য শিশুদের সাথে ঝগড়া কিংবা মারামারি না করা । ছুরি ,কাঁচি এসব ধারালো জিনিস এসব পেলে তারা যাতে না ধরে সেই বিষয়ও শিক্ষা দিতে হবে। শিশুকে দৌড়ানোর জন্য নির্ধারিত স্থান করে দেওয়া।

ভালো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য খুব প্রয়োজনীয়। ভালো থাকবেন।

8 views0 comments