Search

শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য:

শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বলতে গেলে শেষ হবে না, ১০ই অক্টোবর মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ছিলো, লেখাটি ব্যস্ততার জন্য শেষ করে আপলোড করতে পারি নি। আশা করছি, এই লেখাটি পরে আপনার শিশুর এবং আপনার নিজের যত্ন নিয়ে থাকবেন।

শারীরিকভাবে অযত্নের বা অতিযত্নের প্রভাব ও পরিণতি :

শিশুর অযত্নের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয় শিশুর শারীরিক গঠনে। শারীরিক ভাবে এইসকল শিশুরা একটু দুর্বল প্রকৃতির হয় এবং অনেকক্ষেত্রে অতিযত্নে দেখা যায় অতিরিক্ত মোটা গঠনের হয়। ফলে বাড়তি মেদ হোক কিংবা প্রয়োজনীয় মেদের ঘাটতি উভয় শিশুর জন্য ক্ষতিকর। বাংলাদেশে সাধারণত এই দুইধরনের শিশুদের দেখা যায়। সাধারণ দৃষ্টিতে শারীরিক ভাবে দুর্বল প্রকৃতির শিশুদের কম দেখা যায় কিন্তু অতিরিক্ত মেদ বা নাদুস নাদুস বাচ্চা বেশি দেখা যায়। শিশুকে কম খাওয়ানো যেমন শিশুকে অবজ্ঞা করা ঠিক তেমনি জোর করে শিশুকে খাবার খাওয়ানো শিশুর নিজস্ব মতামতকে অবজ্ঞা করা। শিশুকে বেশিরভাগ বাঙালী মায়েরা একটু ২ লোকমা ভাত বেশি খাওয়াতে পারলে খুব খুশি হয়ে থাকেন, মনে করেন বিশাল এওয়ার্ড পাবার মতন অর্জন হয়েছে। কিন্তু শিশুর এই "জোর করে খাবার খাওয়ানো" শিশুর নিজস্ব বুদ্ধিমত্তাকে ধীরে ধীরে নষ্ট করে দেয়, শিশু পরনির্ভরশীল হয়ে পরে। অনেক মা বেশি খাবার খাওয়ানোর জন্য শিশুকে মোবাইল এর সাথে সম্পর্ক তৌরী করে, ধীরে ধীরে শিশুর মোবাইল এডিকশন বেড়ে যায় যা কিনা ভবিষতের জন্য হুমকির।

শারীরিক গঠনের পাশাপাশি এসব শিশুর মানসিক বৃদ্ধিও বয়স উপযোগী হয় না। সমবয়সী শিশুদের সাথে খেলাধুলা কিংবা মেলামেশা সাধারণভাবে পারে না। অপরিচিত পরিবেশে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারে না। চোখে চোখ রেখে উত্তর দাও, সাধারণ জ্ঞানের বিষয়গুলো কোনটাতেই তারা অন্য স্বাভাবিক বাচ্চাদের মতো করতে পারে না। যার পরিণতি তারা অমনোযোগী হয়ে বেড়ে উঠে এবং পড়াশোনায় ক্ষেত্রেও পিছিয়ে থাকে। শিশু যদি তিনবেলা মোবাইল দেখে খাবার খায়, তাহলে শিশু জানবে কি খেলো বা কিভাবে খেলো? শিশুর খাবার সম্পর্কে কোনো পরিপূর্ন ধারণা থাকবে না। কিন্তু এই খাবার যদি শিশু ছড়িয়ে ছিটিয়ে খায় তবে সে বুঝতে পারবে এবং ধীরে ধীরে শিখতে পারবে গুছিয়ে কিভাবে খাবার খায়, এর ফলে শিশুর মানসিক বিকাশ বাড়বে, শিশু বুঝতে পারবে নিয়ম শঙ্খলা, আচরণে আসবে পার্থক্য।

মা শিশুকে নিয়ে ব্যস্ত, বাবা চাকুরী করছেন অথবা মা বাবা দুজনে চাকুরী করছেন শিশু কেয়ারগিভার এর কাছে, যৌথ পরিবারে থেকে ও শিশু একা আবার মা এর সাথে থেকে ও শিশু একা কারন শিশুর সাথে যে সময়টুকু অভিভাবক দিয়ে থাকেন তা হলো খাওয়ানো ফোন দেখিয়ে, গোসল করানো এবং ঘুম পারানো, খুব কম মা বাবা/অভিভাবক আছেন যারা শিশুর জন্মের সাথে সাথে শিশুর সাথে এই তিনটি কাজ ব্যতীত খেলা করেন। সুতারং শিশুর সাথে না খেলতে খেলতে একাকী পরিবেশে শিশু বেড়ে উঠতে থাকে, সবাই আছে কিন্তু শিশুটি একা। এসকল শিশুরা অযত্ন পেয়ে বা অতিযত্ন পেয়ে সঠিক শিক্ষার অভাবে শিশু তার টিনেজ বয়সে বা একটু বড়ো হলে বিভিন্ন সামাজিক অবক্ষয়মূলক কর্মকান্ডের সাথে জড়িয়ে পরে। এই ধরনের শিশুরা নিজস্ব সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে, নিজেরদের ভবিষ্যৎ তারা নষ্ট করে নিজেদের অজান্তে, পরিবারের প্রতিটি মানুষ তখন প্রথমে মা পরবর্তীতে বাবাকে দায়ী করে থাকে কিন্তু এই ছোট্ট শিশুকে এই পরিস্থিতিতে নিয়ে এসেছে পুরো পরিবার। একটি পর্যায়ে এরা নিজেদের পাশাপাশি অন্যদেরও এই অন্ধকার জগতের মধ্যে নিয়ে আসে। সংসারে তখন অশান্তি বিরাজ করে।

শিক্ষা বলতে আমি শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কথা বলছি না, আমি অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার কথা বলছি, যা শিশু পরিবার এবং পারিপার্শ্বিকতা থেকে শিখছে।

শিশুর মনকে বোঝা : শারীরিক অপব্যবহারের চেয়েও সবচেয়ে বেশি ভয়ঙ্কর হলো আবেগিক অপব্যবহার। কারণ শারীরিক অপব্যবহার এর ক্ষতিকারক প্রভাব বাইরে থেকে বোঝা গেলেও আবেগিক প্রভাব কোনোভাবেই বোঝা যায় না। একটি শিশু আবেগিক ভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিজের পরিবার থেকেই। ধরুন: শিশু একটি খেলনা নিয়ে গেলো আপনার কাছে কিন্তু আপনি আপনার ফোন কল নিয়ে ব্যস্ত। বাড়ন্ত বয়সে তার মূল্যবোধকে প্ৰাধান্য না দেওয়া, তার মানসিক সমস্যা বা অসুবিধাগুলোকে গুরুত্ব সহকারে না নেওয়া এই সবই হলো আবেগিক অপব্যহারের লক্ষণ।

আবেগিক সমস্যায় আক্রান্ত শিশুরা খুব অল্প সময়ের মাঝেই আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে এবং তাদের মানসিক বিকাশ ও বৃদ্ধি পায় না। ফলে শারীরিক দিক থেকে কিংবা বাহ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তাদের সুস্থ মনে হলেও সমাজের উন্নয়মূলক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করতে পারে না। এভাবে আস্তে আস্তে তারা সমাজের জন্য বোঝা হয়ে যায়। কিছু শিশুদের মাঝে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় তারা অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পরে।

এখন প্রশ্ন থাকতে পারে একটি শিশু পরিবারের মাধ্যমে কিভাবে আবেগিক অপব্যবহারের শিকার হয়??

যদি শিশু ছোটবেলা থেকে এমন পরিবেশে বেড়ে উঠে যেখানে বাবা মার মাঝে ঝগড়া-বিবাদ অথবা মারামারি লেগে থাকে, বয়স্করা ছোট শিশুদের সাথে কথা না বলে সারাক্ষন দূরে সরিয়ে রাখে। পরিবারের কোনো সদস্য মাদকাসক্ত থাকলে বা কোন কিছুতে আসক্তি থাকে যেমনঃ কম্পিউটার গেম অথবা ফোন অথবা মেক আপ করা। শিশুকে যদি ছোটবেলা থেকে কথায় কথায় মারধর, গালিগালাজ করা হয়, তাদের কথার বা ছোট ছোট চাওয়ার মূল্যয়ন না করা, তাকে অন্যের সামনে অপমান অপদস্থ করা হয়, তার মূল্যবোধ,আত্মসম্মানের প্রাধান্য না দিয়ে পরিবারের সকলের সামনে বারবার অপমান করা হয় তাহলে শিশুর মাঝে এই বিরুপ প্রভাবগুলো দেখতে পাওয়া যায়। শিশুকে মূল্যায়ন করতে অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল হতে হয় না, অনেক মা বাবার ধারণা অনেক দামী খেলনা কিনে দিলে অথবা শিশু যা চায় তাই দিলে শিশুর আবেগিক বিকাশকে মূল্যায়ন করা। কিন্তু আপনাকে কেউ রীতিমত তাচ্ছিল্য করে তারপর যদি ভালো খেলনা কিনে দেয় আপনার কি ভালো লাগবে? সেক্ষেত্রে শিশুর মানসিক বিকাশে বাধাগ্রস্ত হয়।

শিশু আবেগিক অপব্যবহারের শিকার ঘরের বাইরে থেকেও হতে পারে যেমন স্কুল, সহপাঠী, টিচারদের দ্বারা তবে সেক্ষেত্রে পরিবারের সমর্থন ইতিবাচক প্রভাব রাখে কিন্তু শিশু যদি পরিবার দাঁড়াই অপব্যবহারের শিকার হয় তার জন্য এটা সত্যিই খুব কষ্টকর। ভালো থাকবেন। Tripti Podder UK





34 views0 comments